সুমেরীয় পুরাণ দেব-দেবী
সুমেরীয় পুরাণ
সুমেরীয় পুরাণ
(Sumerian Mythology) হলো মানবসভ্যতার প্রাচীনতম পুরাণগুলোর একটি। খ্রিস্টপূর্ব
প্রায় ৪০০০–২০০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ার সুমের অঞ্চলে (আজকের দক্ষিণ ইরাক) এই পুরাণ
গড়ে ওঠে। সুমেরীয়রা দেব-দেবীকে প্রকৃতি, আকাশ-পৃথিবী, জল, প্রেম, যুদ্ধ, কৃষি,
মৃত্যু ইত্যাদির শক্তির প্রতীক মনে করত। প্রতিটি নগররাষ্ট্রের একটি প্রধান দেবতা
ছিল, যিনি সেই শহরের অভিভাবক হিসেবে পূজিত হতেন। নিচে প্রধান সুমেরীয় দেব-দেবীদের
বর্ণনা দেওয়া হলো:
আকাশ ও মহাবিশ্বের দেব-দেবী
১. আন (An / Anu): ইনি ছিলেন সুমেরীয় পুরাণের প্রধান
দেবতা এবং দেবরাজ। তাকে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষাকারী হিসেবে গণ্য করা হতো।
সুমেরীয় রাজাদের ক্ষমতা আন থেকেই আসত বলে বিশ্বাস করা হতো, এবং তাই তিনি রাজনৈতিক
ক্ষমতারও প্রতীক ছিলেন। তাকে প্রায়ই আকাশের প্রতীক হিসেবে চিত্রিত করা হতো।
২. কি (Ki): কি ছিলেন পৃথিবীর দেবী এবং দেবতা আন-এর
সহধর্মিণী। তিনি ভূমি, উর্বরতা এবং জীবনের প্রতীক। সুমেরীয় সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে,
কি এবং আন-এর মিলনের ফলেই পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হয়।
৩. এনলিল (Enlil): এনলিল ছিলেন বাতাস এবং ঝড়ের দেবতা।
সুমেরীয় পুরাণে বলা হয়, তিনিই আকাশ (আন) এবং পৃথিবীকে (কি) একে অপরের থেকে আলাদা
করে মহাবিশ্বকে বর্তমান রূপ দিয়েছেন। তাকে একাধারে নৃশংস এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক
হিসেবে দেখা হতো।
জল ও উর্বরতার দেব-দেবী
৪. এনকি (Enki / Ea): এনকি ছিলেন জল, জ্ঞান, জাদুবিদ্যা
এবং সৃষ্টির দেবতা। তিনি মানুষকে সৃষ্টি এবং সভ্যতার বিকাশে সাহায্য করেছিলেন বলে
বিশ্বাস করা হয়। এনকিকে একজন জ্ঞানী এবং মানবজাতির প্রতি কল্যাণকামী দেবতা হিসেবে
দেখা হতো।
৫. নিনহুরসাগ (Ninhursag / Ki): তিনি ছিলেন একজন প্রধান
মাতৃদেবী, পাহাড় এবং উর্বরতার দেবী। অনেক কাহিনীতে তাকে মানবজাতির সৃষ্টিকর্ত্রী
হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাতৃত্ব এবং জীবনদায়ী শক্তির প্রতীক হিসেবে তার পূজা করা
হতো।
সূর্য-চন্দ্র ও নক্ষত্র দেবতা
৬. উতু (Utu / Shamash): উতু ছিলেন সূর্যের দেবতা এবং
ন্যায়বিচারের প্রতীক। মানুষ বিশ্বাস করত যে তার আলো দিয়ে তিনি সত্য এবং মিথ্যাকে
আলাদা করতে পারেন। তাই তাকে আইন এবং ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে যুক্ত করা হতো।
৭. নান্না (Nanna / Sin): নান্না ছিলেন চাঁদের দেবতা।
তিনি সময়, ভাগ্য এবং আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার পূজা সে সময় বেশ
গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ চাঁদের চক্রের উপর ভিত্তি করে তাদের ক্যালেন্ডার তৈরি হতো।
৮. ইন্নানা (Inanna / Ishtar): ইন্নানা ছিলেন প্রেম,
সৌন্দর্য, যুদ্ধ এবং উর্বরতার দেবী। তিনি সুমেরীয়দের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং
প্রভাবশালী দেবী ছিলেন। পাতালপুরী ভ্রমণের জন্য তার কাহিনী বিশেষভাবে বিখ্যাত, যা
তার ক্ষমতা ও পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
মৃত্যু ও পাতালপুরীর দেবতা
৯. এরেশকিগাল (Ereshkigal): এরেশকিগাল ছিলেন পাতালপুরীর
দেবী। তিনিই মৃতদের উপর শাসন করতেন। তার রাজ্যকে একটি অন্ধকার এবং ভয়াবহ স্থান
হিসেবে বর্ণনা করা হতো। তিনি ছিলেন দেবী ইন্নানার বড় বোন।
১০. নেরগাল (Nergal): নেরগাল ছিলেন যুদ্ধ এবং মৃত্যুর
দেবতা। তাকে প্রায়শই প্লেগ, মহামারী এবং ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত করা হতো। তার নিষ্ঠুর
প্রকৃতি এবং শক্তি তাকে এক ভীতিকর দেবতা হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।
কৃষি, পশুপালন ও নগর দেবতা
১১. দুমুজিদ (Dumuzi / Tammuz): দুমুজিদ ছিলেন পশুপালন
এবং উর্বরতার দেবতা। তিনি ইন্নানার স্বামী। তার কাহিনীতে দেখা যায়, তিনি প্রতি বছর
মৃত্যুবরণ করে পাতালপুরীতে যান এবং পরে পুনর্জীবিত হন। এই পৌরাণিক ঘটনা থেকে
"মৃত্যু ও পুনর্জন্মের" কৃষিজ মিথের সৃষ্টি হয়, যা ফসলের ঋতুচক্রকে
প্রতীকীভাবে প্রকাশ করে।
১২. নিসাবা (Nisaba): নিসাবা ছিলেন শস্য এবং লেখালেখির
দেবী। জ্ঞান এবং শিক্ষার প্রতীক হিসেবে তিনি সুমেরীয় সভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করতেন। তাকে শস্যক্ষেতের অভিভাবক এবং হিসাবরক্ষণের দেবী হিসেবেও পূজা করা
হতো।
সারসংক্ষেপ
সুমেরীয় পুরাণের এই দেব-দেবীরা শুধু প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক
ছিলেন না, বরং তারা সুমেরীয় সমাজ, রাজনীতি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে
গভীরভাবে জড়িত ছিলেন। এই দেব-দেবীদের অনেকেই পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয়
এবং গ্রিক-রোমান পুরাণে ভিন্ন নামে স্থান পান। যেমন—ইন্নানা হয়ে যান ইশতার,
এনকি হন ঈয়া, এবং উতু পরিচিত হন শামাশ নামে। এই ধারাবাহিকতা থেকে
বোঝা যায়, প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতা কীভাবে পরবর্তীকালের সভ্যতাগুলোর
ধর্মবিশ্বাসকে প্রভাবিত করেছিল।
Comments
Post a Comment