গাইয়া ও ইউরেনাস (Gaia and Uranus)

 

একটি রক্তাক্ত কাস্তে, এক চরম ক্ষমতার লড়াই এবং প্রাচীন দেবতাদের জন্ম—গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর গল্পটি মিস করবেন না! 


গাইয়া (Gaia) হলেন পৃথিবীর আদি দেবী এবং ইউরেনাস (Uranus) হলেন স্বর্গের দেবতা। গাইয়া নিজেই ইউরেনাসকে সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে মিলন ঘটে। এই অর্থে, গাইয়াকে স্ত্রী এবং ইউরেনাসকে স্বামী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাইয়া (পৃথিবী) এবং ইউরেনাস (আকাশ)-এর মিলনে বিভিন্ন ধরনের শক্তিশালী সত্তার জন্ম হয়েছিল। গাইয়া (Gaia) বা পৃথিবী মা গ্রিক পুরাণে বিভিন্ন সত্তার জন্ম দিয়েছেন। প্রধানত:

1.    ইউরেনাস (Uranus) – আকাশের দেবতা, গাইয়ার স্বামী

2.    পাহাড় ও পর্বত (Mountains / Hills) – পৃথিবীর স্থিতিশীল অংশ

3.    পন্টাস (Pontus) – প্রাথমিক সমুদ্র বা জল

এরপর গাইয়া ইউরেনাসের সঙ্গে মিলিত হয়ে আরও সন্তান দেন, তাদের প্রধান তিন ধরনের সন্তান হলো:

1.       টাইটানরা (Titans): এরাই ছিলেন গাইয়া ও ইউরেনাসের প্রথম প্রজন্মের সন্তান। মোট বারো জন টাইটান ছিলেন—ছয়জন পুরুষ এবং ছয়জন নারী। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ক্রোনাস (Cronus), যিনি পরে তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেবতাদের রাজা হন। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য টাইটানদের মধ্যে ছিলেন রিয়া, ওশেনাস, তেথিস, হাইপেরিয়ন ইত্যাদি।

গাইয়া (Gaia) ও ইউরেনাস (Uranus)-এর ১২ জন সন্তানকে মূল টাইটান বলা হয়। এই টাইটানদের ছয়জন পুরুষ এবং ছয়জন নারী।

পুরুষ টাইটানরা (Titanes):

·         ওশেনাস (Oceanus): যিনি পৃথিবীর চারপাশের সমুদ্রের (সমুদ্রের নদী) দেবতা।

·         ক্রোনাস (Cronus): টাইটানদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী। তিনি তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে টাইটানদের রাজা হয়েছিলেন।

·         হাইপেরিয়ন (Hyperion): আলো, সূর্য এবং পর্যবেক্ষণের দেবতা।

·         কোয়াস (Coeus): বুদ্ধি এবং ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা।

·         ক্রিয়াস (Crius): তারকামণ্ডলী এবং রাশিচক্রের দেবতা।

·         ইয়াপেতুস (Iapetus): মানবজাতির পূর্বপুরুষ এবং মৃত্যুর দেবতা।

নারী টাইটানরা (Titanides):

·         থেয়া (Theia): দৃষ্টিশক্তি এবং আকাশের আলোর দেবী।

·         রিয়া (Rhea): প্রজনন, মাতৃত্ব এবং পৃথিবীর দেবী। তিনি ক্রোনাসের স্ত্রী এবং অলিম্পিয়ান দেবতাদের মা।

·         থেমিস (Themis): ঐশ্বরিক আইন, ন্যায় এবং শৃঙ্খলার দেবী।

·         ফইবি (Phoebe): ভবিষ্যদ্বাণী এবং চন্দ্রের দেবী।

·         নেমোসাইনি (Mnemosyne): স্মৃতিশক্তির দেবী।

·         তেথিস (Tethys): সমুদ্রের মিষ্টি জলের দেবী।

 

2.       সাইক্লোপসরা (Cyclopes): এরা ছিল একচোখ-বিশিষ্ট বিশালাকার দানব। তাদের নাম ছিল ব্রনতেস, স্টেরোপেস এবং আরগেস। তারা অসাধারণ কারিগর ও নির্মাণকাজে দক্ষ ছিল।

গ্রিক পুরাণে দুই ধরনের সাইক্লোপসের কথা বলা আছে।

১. ইউরেনাস ও গাইয়া-র সন্তান (প্রথম প্রজন্মের সাইক্লোপস): এরা ছিল তিনটি বিশাল একচোখা দানব, যারা কামার (blacksmith) এবং কারিগর হিসেবে বিখ্যাত ছিল। তারা ছিল দেবতাদের জন্য অস্ত্র তৈরির প্রধান কারিগর। তাদের নামগুলো হলো:

·         ব্রনতেস (Brontes): যার নামের অর্থ হলো "বজ্র" (Thunder)।

·         স্টেরোপেস (Steropes): যার অর্থ হলো "বজ্রপাত" (Lightning)।

·         আর্গেস (Arges): যার অর্থ হলো "ঔজ্জ্বল্য" বা "তীব্র আলো" (Vivid-Flash)।

এই তিন সাইক্লোপস দেবতা জিউস-এর জন্য তার বিখ্যাত বজ্র (thunderbolt) তৈরি করে দিয়েছিলেন, যা দিয়ে জিউস তার বাবা ক্রোনাসকে পরাজিত করেছিলেন। পরবর্তীতে তারা দেবতা হেফায়েস্তুস-এর কর্মশালায় কাজ করত এবং দেবতাদের জন্য বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র তৈরি করত।

২. হোমারের "ওডিসি"-তে বর্ণিত সাইক্লোপস: হোমারের মহাকাব্য "ওডিসি"-তে আরেক ধরনের সাইক্লোপসের কথা বলা আছে, যারা ছিল অসভ্য এবং বর্বর রাখাল। এরা পশুপালন করত এবং মানুষ খেত। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো:

·         পলিফেমাস (Polyphemus): সে ছিল সমুদ্র দেবতা পসাইডন-এর পুত্র। ওডিসিউস তার দলবল নিয়ে যখন পলিফেমাসের গুহায় আটকা পড়ে, তখন বুদ্ধি খাটিয়ে পলিফেমাসকে অন্ধ করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

 

3.হেকাটনখেইরিসরা (Hecatoncheires): এই দানবদের প্রত্যেকের ছিল ৫০টি মাথা এবং ১০০টি হাত। তাদের অমিত শক্তির কারণে ইউরেনাস তাদের ভয় পেতেন। তাদের নাম ছিল কটস, ব্রায়ারেউস এবং জাইজেস।

 

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, হেকাটনখেইরিসরা (Hecatoncheires) ছিল গাইয়া (পৃথিবী) এবং ইউরেনাস (আকাশ)-এর সন্তান। তাদের নামের অর্থ হল "একশত হাতওয়ালা"।

তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল খুবই অদ্ভুত এবং শক্তিশালী:

·         প্রত্যেকটির ছিল ৫০টি মাথা।

·         প্রত্যেকটির ছিল ১০০টি হাত।

·         তাদের শরীর এতটাই বিশাল ছিল যে, তাদের শক্তি ছিল তুলনাহীন।

তাদের তিনজন ছিল এবং তাদের নাম হলো:

·         ব্রায়ারেউস (Briareus): যার অর্থ হলো "শক্তিশালী"।

·         কটস (Cottus): যার অর্থ হলো "প্রহারকারী" বা "আঘাতকারী"।

·         জাইজেস (Gyges): যার অর্থ হলো "বৃহৎ অঙ্গ"।

তাদের চেহারা ও শক্তির ভয়ে ইউরেনাস (তাদের বাবা) জন্ম নেওয়ার পরপরই তাদের পাতালের গভীর গহ্বর টার্টারাসে (Tartarus) বন্দী করে রেখেছিল। পরবর্তীকালে, জিউস যখন তার বাবা ক্রোনাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন (টাইটানোমাচিয়া), তখন জিউসের অনুরোধে গাইয়া তাদের মুক্ত করেন। হেকাটনখেইরিসরা তখন জিউস ও অলিম্পিয়ান দেবতাদের পক্ষ নেয় এবং তাদের অসাধারণ শক্তি দিয়ে ক্রোনাস ও টাইটানদের পরাজিত করতে সাহায্য করে। এই যুদ্ধের পর, তারা পাতালপুরীর কারারক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করে এবং পরাজিত টাইটানদের পাহারা দিত।

এছাড়াও, ইউরেনাসের শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তের ফোঁটা থেকে আরও কিছু সত্তার জন্ম হয়, যেমন:

·         ইরিনিস (Erinyes): প্রতিশোধের দেবী, যাদের রোমান পুরাণে ফিউরিস (Furies) নামে ডাকা হয়।

·         গিগান্তেস (Gigantes): বিশালাকার দানব।

·         মেলিয়ে (Meliae): ছাই-গাছের পরী বা জলপরী।

 

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, ক্রোনাস তার বাবা ইউরেনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য একটি নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এই ঘটনাটি গ্রিক সৃষ্টির পুরাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির মধ্যে একটি।

ইউরেনাসের নিষ্ঠুরতা ও গাইয়া-র ক্ষোভ

ইউরেনাস তার সন্তান, বিশেষত সাইক্লোপস ও হেকাটনখেইরিসদের, তাদের কুৎসিত চেহারার কারণে ভয় পেতেন এবং ঘৃণা করতেন। তিনি তাদের জন্মের পরপরই পৃথিবীর গভীর গহ্বর, টার্টারাসে (Tartarus) বন্দী করে রাখতেন। ইউরেনাসের এই নিষ্ঠুর আচরণে গাইয়া (পৃথিবী) গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হন। তিনি তার সন্তানদের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলেন না।

ক্রোনাসের পরিকল্পনা ও আক্রমণ

গাইয়া তার সন্তানদের মধ্যে থেকে ইউরেনাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য একজনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অন্য টাইটানরা তাদের বাবার ভয়ে রাজি হয়নি। কেবল সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ক্রোনাস তার মায়ের পক্ষ নেন।

গাইয়া ক্রোনাসকে একটি বিশেষ ধরনের কাস্তে (sickle) তৈরি করে দেন, যা পৃথিবীর গভীর থেকে প্রাপ্ত উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছিল। গাইয়া ক্রোনাসকে বলেন, যখন ইউরেনাস গাইয়া-র সাথে মিলিত হতে আসবেন, তখন যেন তিনি তার বাবার উপর আক্রমণ করেন।

সন্ধ্যায় ইউরেনাস যখন তার প্রিয় গাইয়া-র কাছে আসেন, ক্রোনাস ওঁত পেতে ছিলেন। এরপর রাতে যখন ইউরেনাস গায়ার সাথে মিলিত হল এবং অবসাদে ঘুমিয়ে পরল তখন ক্রোনাস সেই হীরের কাস্তে দিয়ে পিতার লিঙ্গ কেটে নিল। এ সময় ইউরেনাস ক্রোনাস কে অভিশাপ দিলেন যে,”আমাকে যেমন আমার আপন ঔরসজাত সন্তানের হাতে প্রাণত্যাগ করতে হল তেমনি তোমাকেও নিজের সন্তানের হাতেই জীবন দিতে হবে। কর্মফল অবশ্যই ভোগ করবে তুমি। ” ইউরেনাসের রক্ত থেকে জন্ম নিল এরিনিজ রা যারা দেখতে বেশ বীভৎস এবং তাদের কাজ হল স্বর্গে থেকে পাপীদের বিচার করা। এছাড়া লিঙ্গ সমুদ্রে ফেলার আগে ইউরেনাসের ৩ ফোঁটা রক্ত গিয়ে পড়ল পৃথিবীর বুকে, যা থেকে জন্ম নিল-

1. চকচকে বর্ম ও বর্শাধারী দৈত্যকুল

2. তিন প্রতিশোধদেবী তথা ইরিনিস।

3. সবচেয়ে নিরীহ ও নরমসরম গোছের বনদেবী বা নিম্ফ।

4.এদিকে ইউরেনাস এর লিঙ্গ সমুদ্রে ভেসে থাকা ফেনার সাথে মিশে তৈরি হল কামনা ও ভালবাসার দেবী আফ্রোডাইট।

ক্ষমতা বদল ও নতুন যুগের সূচনা

ক্রোনাস টাইটানদের নতুন রাজা হন। ইউরেনাসের মৃত্যুর পর ক্রোনাস হয়ে উঠলেন স্বর্গ মর্ত্যের একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি তার ভাই-বোনদের টার্টারাস থেকে মুক্ত করেন এবং তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রোনাস বিয়েও করলেন নিজের সুন্দরী বোন রিয়াকে। এতোকিছুর মাঝেও ক্রোনাস কিন্তু এক মুহুর্তের জন্য ও পিতার অভিশাপের কথা ভুল্লেন না। তাই যখনই ক্রোনাসের কোনো সন্তান জন্মাত তখন ই তাদের গিলে ফেলতেন তিনি।

Comments

Popular posts from this blog

Fill in the blanks with explanation

বিসিএস পরীক্ষায় প্রদত্ত Preposition -এর প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা

Auxiliary Verb ও তার ব্যবহার