রিয়া ও ক্রোনাস (Rhea and Cronus)

 

এক মা, এক দানবরাজা, এবং পাঁচটি গিলে ফেলা সন্তান… গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে ট্র্যাজিক কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ গল্পটি রিয়া ও ক্রোনাসের কাহিনী! জিউসের জন্ম, ক্রোনাসের পতন, আর অলিম্পিয়ানদের বিজয়

 

রিয়া ও ক্রোনাস

 

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী রিয়া ও ক্রোনাসের পিতা ও মাতার পরিচয়:

ক্রোনাস (Cronus)

·         পিতা: ইউরানাস (Uranus) – আকাশের দেবতা

·         মাতা: গাইয়া (Gaia) – পৃথিবী

রিয়া (Rhea)

·         পিতা: ইউরানাস (Uranus) – আকাশের দেবতা

·         মাতা: গাইয়া (Gaia) – পৃথিবী

 

রিয়া (Rhea) হলেন একজন টাইটান দেবী, যিনি ছিলেন উর্বরতা, মাতৃত্ব এবং প্রজন্মের প্রতীক। তিনি ছিলেন গাইয়া ও ইউরেনাসের কন্যা এবং ক্রোনাসের বড় বোন ও স্ত্রী।

রিয়া এবং ক্রোনাসের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং করুণ। এটি কেবল প্রেম বা ভালোবাসার গল্প ছিল না, বরং ছিল ক্ষমতা, ভয় এবং প্রতিরোধের এক গাথা।

শুরুতে তাদের সম্পর্ক: টাইটানদের মধ্যে ক্রোনাস এবং রিয়া ছিলেন প্রধান দুই শক্তি। ক্রোনাস তার বাবা ইউরেনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর টাইটানদের রাজা হন। রিয়া ছিলেন তার রানী। তাদের সম্পর্কটি ছিল অনেকটা রাজকীয় বিবাহের মতো, যেখানে তারা সিংহাসনে একসঙ্গে বসেছিলেন এবং শাসন করতেন। তাদের মিলনে অলিম্পাসের প্রথম প্রজন্মের দেবতাদের জন্ম হয়েছিল।

ক্রোনাসের পরিকল্পনা ও আক্রমণ

ইউরেনাস তার সন্তান, বিশেষত সাইক্লোপস ও হেকাটনখেইরিসদের, তাদের কুৎসিত চেহারার কারণে ভয় পেতেন এবং ঘৃণা করতেন। তিনি তাদের জন্মের পরপরই পৃথিবীর গভীর গহ্বর, টার্টারাসে (Tartarus) বন্দী করে রাখতেন। ইউরেনাসের এই নিষ্ঠুর আচরণে গাইয়া (পৃথিবী) গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হন। তিনি তার সন্তানদের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছিলেন না। গাইয়া তার সন্তানদের মধ্যে থেকে ইউরেনাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য একজনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অন্য টাইটানরা তাদের বাবার ভয়ে রাজি হয়নি। কেবল সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ক্রোনাস তার মায়ের পক্ষ নেন।

গাইয়া ক্রোনাসকে একটি বিশেষ ধরনের কাস্তে (sickle) তৈরি করে দেন, যা পৃথিবীর গভীর থেকে প্রাপ্ত উপাদান দিয়ে তৈরি হয়েছিল। গাইয়া ক্রোনাসকে বলেন, যখন ইউরেনাস গাইয়া-র সাথে মিলিত হতে আসবেন, তখন যেন তিনি তার বাবার উপর আক্রমণ করেন।

সন্ধ্যায় ইউরেনাস যখন তার প্রিয় গাইয়া-র কাছে আসেন, ক্রোনাস ওঁত পেতে ছিলেন। এরপর রাতে যখন ইউরেনাস গায়ার সাথে মিলিত হল এবং অবসাদে ঘুমিয়ে পরল তখন ক্রোনাস সেই হীরের কাস্তে দিয়ে পিতার লিঙ্গ কেটে নিল। ইউরেনাসের রক্ত থেকে জন্ম নিল এরিনিজ রা যারা দেখতে বেশ বীভৎস এবং তাদের কাজ হল স্বর্গে থেকে পাপীদের বিচার করা। এছাড়া লিঙ্গ সমুদ্রে ফেলার আগে ইউরেনাসের ৩ ফোঁটা রক্ত গিয়ে পড়ল পৃথিবীর বুকে, যা থেকে জন্ম নিল-

1. চকচকে বর্ম ও বর্শাধারী দৈত্যকুল

2. তিন প্রতিশোধদেবী তথা ইরিনিস।

3. সবচেয়ে নিরীহ ও নরমসরম গোছের বনদেবী বা নিম্ফ।

4.এদিকে ইউরেনাস এর লিঙ্গ সমুদ্রে ভেসে থাকা ফেনার সাথে মিশে তৈরি হল কামনা ও ভালবাসার দেবী আফ্রোডাইট।

ক্ষমতা বদল ও নতুন যুগের সূচনা

ক্রোনাস টাইটানদের নতুন রাজা হন। ইউরেনাসের মৃত্যুর পর ক্রোনাস হয়ে উঠলেন স্বর্গ মর্ত্যের একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি তার ভাই-বোনদের টার্টারাস থেকে মুক্ত করেন এবং তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ক্রোনাস বিয়েও করলেন নিজের সুন্দরী বোন রিয়াকে।

ক্রোনাসের ভয় এবং রিয়ার বেদনা: ইউরেনাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ক্রোনাস একটি অভিশাপ পেয়েছিলেন। ইউরেনাস ক্রোনাস কে অভিশাপ দিলেন যে,”আমাকে যেমন আমার আপন ঔরসজাত সন্তানের হাতে প্রাণত্যাগ করতে হল তেমনি তোমাকেও নিজের সন্তানের হাতেই জীবন দিতে হবে। কর্মফল অবশ্যই ভোগ করবে তুমি। ”এই ভয়ে ক্রোনাস তার সন্তানদেরকে জন্ম নেওয়ার পরপরই গিলে ফেলতে শুরু করেন। রিয়া একে একে পাঁচটি সন্তানের জন্ম দেন, আর ক্রোনাস নির্দয়ভাবে তাদের গিলে ফেলেন। এই সন্তানরা হলেন:

1.  হেস্তিয়া (Hestia): উনুন ও গৃহস্থালির দেবী

2.  দেমেতের (Demeter): শস্য ও কৃষির দেবী

3.  হেরা (Hera): বিবাহ ও পরিবারের দেবী, জিউসের স্ত্রী

4.  হেডিস (Hades): পাতালপুরীর অধিপতি

5.  পোসেইডন (Poseidon): সমুদ্রের দেবতা

প্রতিবার যখন ক্রোনাস একটি সন্তানকে গিলে ফেলতেন, রিয়া তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতেন। সন্তানের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা এবং তাদের বাঁচাতে না পারার বেদনা তাকে জর্জরিত করে তুলেছিল।

জিউসের জন্ম এবং ক্রোনাসের পতন: ষষ্ঠ সন্তান যখন গর্ভে আসে, রিয়া তার মা গাইয়া এবং বাবা ইউরেনাসের কাছে সাহায্য চান। তারা রিয়াকে একটি পরিকল্পনা দেন। রিয়া ক্রিট দ্বীপে একটি গোপন গুহায় জিউসকে (Zeus) জন্ম দেন। তিনি জিউসকে লুকানোর পর একটি পাথরকে কাপড়ে মুড়ে ক্রোনাসের কাছে নিয়ে যান। ক্রোনাস সেই পাথরকেই তার সন্তান ভেবে গিলে ফেলেন।

গোপনে বেড়ে ওঠা জিউস বড় হওয়ার পর ক্রোনাসকে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হন। জিউস টাইটানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, যা ইতিহাসে টাইটানোমাকি (Titanomachy) নামে পরিচিত। এই যুদ্ধে জিউস ও অলিম্পিয়ানরা বিজয়ী হন। ক্রোনাস তার গিলে ফেলা সন্তানদেরকে (হেস্তিয়া, হেডিস, হেরা, পসাইডন, ডমিটার) অবশেষে বমি করে বের করে দেন।

রিয়ার পরবর্তী জীবন: জিউসের বিজয়ের পর রিয়া দেবতাদের মা এবং সম্মানিত দেবী হিসেবে স্বীকৃতি পান। তিনি অলিম্পিয়ানদের পাশে থাকলেও তার জীবন থেকে ট্র্যাজেডি পুরোপুরি মুছে যায়নি। তার স্বামী ক্রোনাসকে টার্টারাসে (পাতালের গভীর গহ্বর) বন্দী করা হয়। তার সন্তানেরা যখন নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু করে, তখন তিনি তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। রিয়াকে প্রায়শই সিংহের টানা রথে দেখা যায়, যা তার মাতৃত্ব, শক্তি এবং প্রকৃতির উপর কর্তৃত্বের প্রতীক।

রিয়ার জীবনের গল্পটি গ্রিক পুরাণে মাতৃত্বের এক গভীর এবং করুণ দিক তুলে ধরে, যেখানে একজন মা তার সন্তানদের বাঁচাতে এবং তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে একাই লড়াই করেন।

Comments

Popular posts from this blog

Fill in the blanks with explanation

বিসিএস পরীক্ষায় প্রদত্ত Preposition -এর প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা

Auxiliary Verb ও তার ব্যবহার